প্রতিবেদক: নজরুল ইসলাম
ভোর ৫টা।
ঘুম ভাঙে ইটভাটার চিমনির ধোঁয়া আর শ্রমিকদের হাঁকডাকে।
এই সময় যখন একটি ৮ বছরের শিশুর হাতে থাকার কথা বই-খাতা, বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের একাধিক ইটভাটায় ছোট্ট হাতে শুরু হয় ইট বানানোর নির্মম শ্রম।

শিশুটির নাম সাকিব। বয়স মাত্র ৮ বছর।
🔹 ইটভাটায় সাকিবের দিন
সাকিব কখনো ইট বানায়, কখনো ইট তৈরির মাটি মেকিং করে।
রোদ, ধুলো আর কাদার মধ্যেই কাটে তার পুরো দিন।
তার বাড়ি নোয়াখালীর সোনাপুরে।
বড় ভাই রাকিব একই ইটভাটায় শ্রমিক।
বাবাও কাজ করেন এখানেই।
আমি ছদ্মবেশে ইটভাটার একজন গাড়ির শ্রমিক পরিচয়ে সাকিবের সঙ্গে কথা বলি।
আমি: আসসালামু আলাইকুম।
সাকিব: জ্বি, আন্নে কে?
আমি: আমি নজরুল ইসলাম, তোমাগো ইটভাটার গাড়ির শ্রমিক। তোমার নাম কী?
সাকিব: আর নাম, সাকিব।
আমি: তোমার বয়স কত?
সাকিব: ৮ বছর।
আমি: তুমি এখানে কী কাজ করো?
সাকিব: কখনো ইট বানাই, কখনো মাটি মেকিং করি।
আমি: স্কুলে যেতে মন চায় না?
সাকিব: হ, মন চাই। কিন্তু মন চাইলে কি স্কুলে যাইতে পারমু?
আমি: কেন?
সাকিব: বাবা ইটভাটায় কাজ করে। বড় ভাইও। বর্ষা মৌসুমে অগ্রিম টাকা নেয়। তখন বাবা কয়—আমি কাজ করমু। এক মৌসুমের জন্য ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে আমি বিক্রি হইয়া যাই।
৮ বছরের শিশুর মুখে “বিক্রি” শব্দটি বুক চিরে বেরিয়ে আসে।
আমি: কখনও স্কুলে গেছো?
সাকিব: না। খুব মন চাই। অন্য ছেলেদের মতো আমি ব্যাগ নিয়া স্কুলে যেতে চাই।
আমি: বড় হয়ে কী হতে চাও?
সাকিব: বড় হইয়া আর কী হমু? ইটভাটার মধ্যম ধরণের শ্রমিক, না হয় দিনমজুর।
ক্ষুধা, অপরিচ্ছন্নতা আর অসুস্থতার ঝুঁকি
সাকিবের প্রতিদিনের জীবন।
🔹 অন্য একদিন, অন্য চুল্লি: ১৩ বছরের জমির
ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ১০টা ১৪ মিনিট।
এইদিন আমি নতুন ছদ্মবেশ নেই—একজন হেবলা, অটিস্টিক স্বভাবের মানুষ।
পকেটে গোপন মোবাইল, চোখে শুধু ধোঁয়ার চিমনি দেখার ভান।
একটি ছেলেকে দেখে কথা বলি।
আমি: আমার বাড়ির ওইদিকে এত সুন্দর ধোঁয়ার মেশিন নাই, তাই এখানে দেখতে আসছি। তোমার নাম কী?
জমির: আই জমির। আন্নে ইয়ানে কিল্লাই আইছেন?
আমি: আমগো এলাকায় এমন ধোঁয়ার মেশিন নাই। এক খালার বাড়িতে বেড়াইতে আইছি, তাই দেখতে আসছি।
জমির ভাত খেতে যাবে জানায়। আমি চুপচাপ এক পাশে বসে থাকি।
আমি: তোমার বয়স কত? কোথা থেকে এসেছো? কতদিন ধরে কাজ করো?
জমির: আমার বয়স ১৩ বছর। বাড়ি নোয়াখালী, আলীর দোকান। এই ব্রিকফিল্ডে নতুন। এর আগে দুই বছর অন্য ইটভাটায় কাজ করেছি।
আমি: দিনে কত টাকা পাও?
জমির: আমরা আগে আগে টাকা নিয়া ফেলি। আমি ৫৫ হাজার টাকা অগ্রিম নিছি।
আমি: এখন তোমাকে কি টাকা দিবে না?
জমির: না।
আমি: তাহলে খরচ কিভাবে করো?
জমির: বাড়ি থেইকা নিয়ে আসি। এই দুই মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
তারপর সে তাড়া অনুভব করে, কাজের চাপ আবার শুরু হয়।
জমির: আমার দেরি হইবো। ইট কম বানাইলে গালি শুনবো। এখন আর কথা কইতে পারমু না।
আমি চলে আসি, কিন্তু চোখের সামনে বাজে—১৩ বছরের হাতে বই না উঠে,
কেবল কোদাল আর ইট।
🔹 শিশু শ্রমের বাস্তবতা
সাকিব (৮) আর জমির (১৩)–
দুইজন, দুই জায়গা, দুই গল্প।
কিন্তু বাস্তবতা এক।
মৌসুমি চুক্তি, অগ্রিম বেতন, দালাল
অসুস্থতা, ক্ষুধা, অপরিচ্ছন্নতা
হারানো শৈশব, থেমে যাওয়া স্বপ্ন
শিশুশ্রম কোনো ব্যক্তিগত দুঃখ নয়।
এটি সামাজিক অপরাধ,
যার দায়ভার আজ আমরা সবাইকে নিতে হবে।
🔹 শেষ কথা
আজ যদি সাকিব ও জমিরের হাতে বই না ওঠে,
কাল সেই দায় আমাদের সবার ঘাড়েই পড়বে।
স্টাফ রিপোর্টার 









