বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে “ঐক্য” কখনোই সহজ ছিল না। তবে ঐক্যের ব্যর্থতার পেছনে সবসময় মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব নয়—অনেক সময় এর পেছনে ছিল সচেতন বিশ্বাসঘাতকতা, ক্ষমতার লোভ এবং সংগঠনের স্বার্থকে উম্মাহর স্বার্থের ঊর্ধ্বে তুলে ধরার নোংরা রাজনীতি। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে যা ঘটেছিল, আজ তা নতুন মুখে, নতুন সময়ে আবার ফিরে আসছে।
১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইসলামী ঐক্যের প্রয়োজন যখন তীব্র হয়ে উঠেছিল, তখন দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ইসলামী নেতৃবৃন্দ কেল্লার মোড় খেলাফত আন্দোলন অফিসে নিয়মিত বৈঠকে বসেছিলেন। লক্ষ্য ছিল একটাই—স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী সংগ্রামে ইসলামী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেওয়া।
সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগে শরিক ছিলেন মাওলানা আবদুর রহিম (র.), শায়খুলহাদিস আল্লামা আজিজুল হক (র.), পীর সাহেব চরমোনাই (র.), আব্দুল কাদির বাচ্চু, পীর আবদুল জাব্বারসহ বহু নেতা। আর আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীকে—যিনি তখনো প্রকাশ্যে জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলে দাবি করতেন।
যখন এই ঐক্য বাস্তব রূপ নিতে শুরু করল, কমলাপুরের ঐক্যবদ্ধ সমাবেশ সফল হলো এবং শাপলা চত্বরে লক্ষ মানুষের সমাবেশের প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই জামায়াতে ইসলামী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কারণ তারা বুঝে গিয়েছিল—এই ঐক্য সফল হলে জামায়াতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যাবে এবং তারা যার দোসর তাদের ক্ষতি হবে। তাই তারা আন্দোলনের মুখপাত্র সাঈদী সাহেবকে রাতারাতি উমরার নামে দেশছাড়া করে দিলো। যাওয়ার আগে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে তিনি বললেন—ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। এটি ছিল সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা, প্রকাশ্য ডিগবাজি এবং ইসলামী রাজনীতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়।
উমরা এখানে ইবাদত নয়, হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক ঢাল—যার আড়ালে একটি সম্ভাবনাময় ইসলামী ঐক্যকে গলা টিপে হত্যা করা হয়।
১৩ মার্চ ১৯৮৭। শাপলা চত্বর। আন্দোলনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এরশাদের পুলিশ বাহিনী। লাঠিচার্জে রক্তাক্ত হন শায়খুলহাদিস আজিজুল হক (র.), পীর সাহেব চরমোনাই (র.)সহ অসংখ্য আলেম। আর তখন জামায়াতে ইসলামী? তারা ছিল নিরাপদ দূরত্বে—স্বৈরাচারের সঙ্গে আপস করে নিজেদের রাজনীতি বাঁচাতে ব্যস্ত।
এই ইতিহাস ভুলে যাওয়ার নয়।
আজ নির্বাচন সামনে রেখে যখন ইসলামী দলগুলোর ঐক্য আবারও গড়ে উঠছে, যখন আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান উমরায় যাচ্ছেন। তিনি আমার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, তবু আমার প্রশ্ন—এটি কি নিছক ইবাদত, নাকি আবারও সময়ক্ষেপণ ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল?
কারণ ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—জামায়াতের নেতৃত্ব সংকটে পড়লেই তারা ঐক্য থেকে সরে দাঁড়ান। কখনো উমরা, কখনো অসুস্থতা, কখনো রাজনৈতিক নীরবতা—কিন্তু ফলাফল একটাই: ইসলামী ঐক্যের ভাঙন।
ঐক্যের শত্রু কারা—উম্মাহকে জানতে হবে। আজ যদি ইসলামী রাজনীতির কর্মীরা আবারও অতীতের ফাঁদে পা দেয়, তাহলে দায় শুধু জামায়াতের নয়, দায় অসচেতন থাকায় সবার। ইসলামী ঐক্য কোনো দলের সম্পত্তি নয়, কোনো আমীরের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ও নয়।
উমরা মহান ইবাদত—কিন্তু উমরার আড়ালে যদি রাজনৈতিক বুদ্ধি লুকিয়ে থাকে, তবে তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে উমরা ইসলামী ঐক্য ভেঙেছিল। ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে তা আবার হতে চলছে। আল্লাহ এই উম্মাহকে হেফাজত করুন। আমিন।

(বি. দ্র. : ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের মিছিলগুলোতে আমিও ছিলাম। ছবিতে মিছিলে সবার আগে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি গায়ে আমি সৈয়দ মবনু )
সৈয়দ মুমিন আহমদ মবনু
ইসলামী স্কলার, লেখক
স্টাফ রিপোর্টার 



